কনকপুর (মুরারই) -- অজানা তথ্য
বীরভূম জেলায় অনেক প্রাচীনকালের কিছু নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে। সেই সব স্থানগুলি পর্যটন মানচিত্রে তুলে আনলে একটা বিরাট পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলার উত্তরে মুরারই এলাকায় প্রাচীন নিদর্শনগুলির মধ্যে রয়েছে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর স্মৃতি বিজড়িত অনেক অজানা ইতিহাস। যেমন যুদ্ধক্ষেত্র, গড়, পখিরা, অতিপ্রাচীন মন্দির, দরগা সরোবর ইত্যাদি। মুরারই-১ ব্লকের পশ্চিমে ঝাড়খণ্ড সীমানা লাগোয়া কনকপুর, সারদুয়ারি ও মলয়পুর গ্রামে অনেক প্রাচীন মন্দির রয়েছে। তার মধ্যে কনকপুর গ্রামের অপরাজিতা মন্দিরটি অতি প্রাচীন। এই মন্দিরকে ঘিরে পার্শ্ববর্তী জেলা মুর্শিদাবাদ ও ঝাড়খণ্ডের মানুষের দীর্ঘদিনের আবেগ ছড়িয়ে রয়েছে।
গ্রামবাসীরা বলেন, দুর্গা পুজোর সময় নবমী ও দশমীর দিন গ্রামে প্রাচীনকাল থেকেই বসে মিলনমেলা। মিলনমেলা এই কারণেই যে এই গ্রামে হিন্দু-মুসলিমরা মিলিতভাবে উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। প্রবীণ মানুষেরা বলেন, আগে দুর্গাপুজোর সময় জমিদার বাড়িতে আলকাপ-যাত্রা গানের আসর বসতো। এই অপরাজিতা মন্দিরের নামে অনেক জমিজমা ছিল। এখন মন্দিরের জায়গা ছাড়া কিছুই নেই। এখন এই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে ট্রাস্ট। বহু দূর দূরান্তের মানুষ আসেন এই মন্দির দর্শনে। মন্দিরকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে হাট-বাজার-ব্যাঙ্ক।
এই কনকপুর গ্রামে হিন্দু মুসলমান, তফসিলি-আদিবাসী মানুষের বসবাস। গ্রামের উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রাক্তন প্রধানশিক্ষক রামকৃষ্ণ সিংহ ও কনকপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মোস্তাক আহমদ জানালেন, এই অপরাজিতা মন্দিরটি ছিল একদম গ্রামের পশ্চিম দিকে ঝাড়খণ্ড সীমানা এলাকার লাডুবি নামক একটি দিঘির ধারে। কালাপাহাড় এই মন্দিরটি ধ্বংস করে দেয়।
জানা যায়, বাংলা, বিহার, ওডিশার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর অধীনে ছিলেন দেবীনগরের রাজা উদয়নারায়ণ সিংহ। রাজা উদয়নারায়ণ সিংহ স্বাধীন রাজা হিসাবে নিজেকে ঘোষণা করায় মুর্শিদকুলি খাঁর সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয়। আর সেই যুদ্ধ হয়েছিল কনকপুর গ্রামের পশ্চিমে মুণ্ডমালার ডাঙ্গায়। বহু সৈন্যের মৃত্যু হয়েছিল সেই যুদ্ধে। সেই ডাঙ্গায় মৃত সৈন্য সামন্তদের গণকবর দেওয়া হয়। আজ ওই যুদ্ধক্ষেত্রটি পাথর খাদানে পরিণত হয়েছে। ডাঙার চিহ্ন বলতে কতগুলো হ্রদ ও দ্বীপের সমারহে পরিণত হয়েছে। আর গণকবরটি ঝুলছে খাদের কিনারায়। এখন সেখানে আর পাথর না থাকায় মানুষের ভ্রমণের স্থান হয়েছে।
এছাড়াও নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর দুর্গ, মাটির তৈরি গড়, পরিখা, এবং সেই আমলের ধলো দরগাটি ঝাড়খণ্ডের দমদমা গ্রামের মধ্যে অবস্থিত। যোগমায়া বইটিতে বর্ণিত রয়েছে ওই যুদ্ধে রাজা উদয়নারায়ণ সিংহ পরাজিত হয়ে পালিয়ে গিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন দেবীনগরের সরোবরের সুড়ঙ্গ পথে নৌকা করে কনকপুর গ্রামের দিঘিতে। এছাড়াও কনকপুর গ্রামে রয়েছে বহু প্রাচীন শিব মন্দির, জোড়া মন্দির, জমিদার বাড়ি ও দরগা।
এদিকে কনকপুরের উত্তরে মলয়পুর গ্রামে রয়েছে ‘‘বসন্তবুড়ি’’র মন্দির। মন্দির এলাকায় ৮টি ছোট বড় পুকুর রয়েছে। যার আয়তন প্রায় ১০০ বিঘা। এই সম্পত্তি সরকারি হওয়ায় বামফ্রন্ট আমলে মুরারই-১ পঞ্চায়েত সমিতি সেখানে গড়ে তোলে জল বিভাজিকা প্রকল্প। একদিকে পুকুরে মাছের চাষ এবং তার পাড়ে বিভিন্ন ফলের গাছসহ বৃক্ষরোপণ করে। তার চারিপাশে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে এলাকাটিকে এক পিকনিক স্পট হিসাবে গড়ে তুলেছিল। এর দেখভালের জন্য ২ জন কর্মচারী ও নাইট গার্ড রাখা হয়েছিল। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর এলাকাটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এলাকার মানুষের দাবি একে পুনরায় সংস্কার করে আগের চেহারায় ফিরিয়ে আনুক সরকার। এছাড়া বীরনগরের রাজবাড়ি দর্শনীয় স্থান হিসাবে পরিচিত।


1 Comments
যোগমায়া বই টি কোথায় পাওয়া যাবে??
ReplyDelete