Games

The Voice of Murarai

জাজিগ্রামে ‘কারণ সুধা’ দিয়ে ভরা হয় দিগম্বরকালীর ঘট

11

প্রস্তুতি। বহরমপুরে গৌতম প্রামাণিকের তোলা ছবি।

সেই শ্রাবণ মাস থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে প্রতিমা গড়ার কাজ। পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে কোজাগরী পূর্ণিমা পেরিয়ে কৃষ্ণপক্ষ পড়তেই। কোনও বাড়িতে আবার একটি দু’টি নয়, একাধিক পুজোর আয়োজন চলছে সেই আবহমান কাল ধরে। সেই দায় অনেক পরিবারের কাছে এখন বড় বালাই হয়ে উঠলেও উৎসবের খামতি নেই জাজিগ্রাম ও হিলোড়া গ্রামে। বীরভূম ও মুর্শিদাবাদ—দুই জেলার দুই প্রান্তিক গ্রাম এসে মিশেছে একে অন্যের গায়ে। দুর্গা নয়, কালীপুজোই এখানে শারদোৎসব। অমাবস্যার রাতে ঘরে ঘরে কালীপুজোর উৎসবে মেতে ওঠে দুই গ্রাম। প্রতিমার সংখ্যা এখন কমেছে তবু জৌলুষ ফিকে হয়নি এতটুকু।
পুজোর পরের রাতে নিরঞ্জনের পথে শোভাযাত্রা-সহ সারিবদ্ধ প্রতিমা, চোখ ধাঁধানো আলো দেখতে দুই জেলা থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থীর ভিড় করেন। মেলা চলে সপ্তাহ ধরে। হ্যাজাকের জায়গা নিয়েছে বিদ্যুৎ বাতির রোশনাই। কিন্তু গ্রামবাসীদের কাঁধে চেপে রাতভর একগ্রাম থেকে প্রতিমা ছুটছে অন্য গ্রামে। কয়েকশো বছরের প্রাচীন এই প্রথা বিলুপ্ত হয়নি আজও।
জাজিগ্রামে বাড়িতেই তিন তিনটি কালীপুজোর আয়োজন করেন মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, দুই জেলার প্রান্তে অবস্থিত ওই সব গ্রাম একসময় বনজঙ্গলে ভরা ছিল। জনবসতি বলতে কিছুই ছিল না। বহু সাধু, তান্ত্রিক তন্ত্র সাধনার জন্য জঙ্গলবেষ্টিত এই গ্রামকেই বেছে নিতেন। শোনা যায় সাধক বামাক্ষ্যাপাও সাধনার জন্য গিয়েছিলেন এই গ্রামে। তন্ত্র সাধনার ক্ষেত্র হিসেবে সাধু, তান্ত্রিকরাই প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন ওই সব কালীপুজোর। পরে সে সব পুজোর দায় নেন এলাকার  জমিদার ও বিত্তশালী পরিবারগুলি। তিনি বলেন, ‘‘আজও গ্রামের বহু জায়গাই ‘কূর্ম পৃষ্ঠাকৃতি ভূমি’ দেখা যায়। লোকশ্রুতি ওই উঁচু জায়গায় সাধনা করতেন তান্ত্রিকেরা।’’
দুই গ্রামের কালীমূর্তির নামকরণেও রয়েছে বৈশিষ্ট্য। এখানে দেবী বকুলেশ্বরী, শিয়ালেশ্বরী, দিগম্বরী, বাঞ্ছাময়ী, নিত্যকালী, ইচ্ছাময়ী, ভাটেশ্বরী ইত্যাদি নামে পূজিতা হন। তবে ওই এলাকায় সবচেয়ে প্রাচীন দেবী হলেন বৃদ্ধামাতা কালী। পক্ককেশী কালী মূর্তির দুই কানে দুল হিসেবে ঝুলছে দুই শিশু। বৃদ্ধামাতা কালী পুজোর আয়োজক বয়োবৃদ্ধ হরিসদয় মজুমদার বলেন, ‘‘বিহারের মহেশপুরের (এখন ঝাড়খণ্ড) রাজাদের ‘মাহাল’ (জমিদারি ) ছিল এই এলাকায়। তাঁরাই এক সময় বৃদ্ধামাতা কালীপুজোর দায়িত্ব নেন। পরে সে পুজোর দায় এসে পড়ে আমাদের পরিবারের উপর।’’ অথচ তাঁর বাড়িতেই বাঞ্ছাময়ী কালীর পুজো হয়ে আসছে প্রায় ১১৬ বছর থেকে। তিনি বলেন, ‘‘একসঙ্গে দুটো পুজো সামলাতে এখন প্রাণান্তকর অবস্থা। তবু পারিবারিক প্রথা বন্ধ তো করা যায় না।’’
গ্রামের বাসিন্দা পার্থ মুখোপাধ্যায় জানান, কালীপুজোর রাতে বেদীতে প্রথম তোলা হয় বৃদ্ধামাতাকে। বিশাল শব্দে ফাটানো হয় প্রথম পটকা। সেই শব্দ শুনেই একে একে বেদীতে ওঠে বাকি প্রতিমা। বৃদ্ধামাতার পুজোর সূচনা হতেই ফাটে দ্বিতীয় পটকা। পটকার শব্দ শুনেই শুরু হয় গ্রাম জুড়ে কালীপুজো। শেষ পটকা ফাটিয়ে শুরু করা হয় বৃদ্ধামাতার বলিদান। মধ্যরাত থেকে প্রায় শ’দুয়েক বলিদান বৃদ্ধামাতার মণ্ডপে। বিভিন্ন কালীমূর্তির এখানে পুজোর রীতিতেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। সব কালীপুজোতেই গঙ্গা জলকে শুদ্ধ মেনে করা হয় পুজোর আয়োজন।
আবার গঙ্গাজল নিষিদ্ধ দিগম্বরী কালীর পুজোয়। ‘কারণ সুধা’ দিয়ে ভরা হয় দিগম্বরীকালীর ঘট। কোশাকুশিতেও ঢালা হয় সেই সুধা। এই কালীর চক্ষুদান করা হয় ছাগ বলিদানে। তারপরেই প্রতিমা বসানো হয় পঞ্চমুন্ডির আসনে। দয়াময়ী কালীর পুজোয় ভোগ হয় পোলাও, ইলিশ মাছ ও পোস্তর বড়া দিয়ে।
পিছিয়ে নেই হিলোড়ার গ্রামের পুজোও। বাজারেশ্বরী কালীপুজোর আয়োজকরা বাইরে থাকেন। কিন্তু পুজো করতে প্রতি বছর গ্রামে আসেন। মুক্তকেশী কালী পারিবারিক কৌলিন্য ছেড়ে এখন বারোয়ারি। একইভাবে বারোয়ারি হয়েছে আশাপূর্ণা কালীও। বামাকালীর উদ্যোক্তারাও বাইরে থেকে এসেই পুজো সেরে ফের গ্রাম ছাড়েন। একসময় এই দুই গ্রামের বিড়ম্বনা ছিল যোগাযোগের সড়ক। এখন সংস্কার হয়ে অনেক উন্নত হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে জন সমাগম বেড়ে কালীপুজো  দুই গ্রামের বার্ষিক উৎসবে রূপ নিয়েছে। কয়েকশো দোকানপাট বসে। প্রতি বাড়িতে আত্মীয় কুটুম্বদের ভিড় লেগে থাকে। কালীপুজোর এখনও কয়েক দিন দেরি। কিন্তু ইতিমধ্যেই উৎসবের ছোঁয়া লেগেছে হিলোড়া ও জাজিগ্রামে। 

Post a Comment

0 Comments