Games

The Voice of Murarai

বীরভূমের হারিয়ে যাওয়া কিছু লোক ছড়া

লালমাটির জেলা বীরভূম। শাল মহুয়ার জঙ্গলে ঘেরা এই জেলা। যুগ যুগান্তরে বহু মহাপুরুষের জন্ম হয়েছে এই বীরভূমের মাটিতে। কালের মহাস্রোতে সময় এগিয়ে গেছে এবং সময়ের সঙ্গে আজ অনেক কিছু বিলীন হয়ে গেছে। 

গ্রাম যেমন শহরে উঠে এসেছে তেমনি শহরের ছাপও গ্রামে গঞ্জে পড়েছে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। গ্রামের সমাজ, সংস্কৃতি, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট,চাষবাস, খাদ্য, পোষাক, পরিচ্ছদ, ভাষা সবকিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে।
কৃষিনির্ভর এই জেলা। বেশীরভাগ মানুষ চাষবাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত। আজ থেকে যদি অন্তত পঞ্চাশ ষাট বছর পিছনে ফিরে তাকানো যায় তাহলে দেখা যাবে তখনকার দিনের সঙ্গে এখনকার জীবন যাত্রার ফারাক কতখানি।
তখন ছিল একান্নবর্তী পরিবার। পরিবারের মাথা ছিল বাড়ির সব থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য। তিনি গোটা পরিবারকে পরিচালনা করতেন। কৃষিভিত্তিক পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সারাদিন মাঠে ঘাটে কাজ কর্ম করে সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে সাঁঝের প্রদীপের আলোয় খাওয়া শেষ করে গ্রামের নাট মন্দিরে, চন্ডী মন্ডপে বা কারোর বাড়ির বড় উঠানে সকলে মিলে রাঢ়ীয় যে লোক সংস্কৃতি রামযাত্রা, কৃষ্ণ যাত্রা, ভাদু, ঝুমুর, বুলান, লেটো আলকাপের আসর বসত। এতে তারা আনন্দে মেতে থাকত।
আর বাড়ির মেয়েরা রান্নাবান্নার কাজ কর্ম সেরে খাওয়ার পর দুপুরের পরে এক সঙ্গে বসে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাতের কাজ যেগুলি গৃহস্থালির কাজে লাগবে যেমন- বসার আসন বোনা, তালপাতা দিয়ে হাত পাখা বানানো, পাটি তৈরী, কাঁথা তৈরী ইত্যাদি আর সেই সঙ্গে কথায় কথায় ছড়া কাটতে তারা ছিল পারদর্শিনী। আজ কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা কার্যপ্রণালী, ভাব-ভাষা সব কিছুরই আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে।
অতীত পেরিয়ে গেলে বহু জিনিস যেমন ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়। তেমনি আবার অনেক কিছু আছে যা কালের নিয়মে কোথাও স্থান না পেয়ে মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়। এমন একদিন আসবে যখন সেগুলি আর শোনা যাবে না। এই রকমই কিছু ছড়া আমার মাকে সামনে বসিয়ে কিছু সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। সেগুলি আমি তুলে ধরার চেষ্টা করছি। অনেক ভুল ত্রুটি হতে পারে। যদি কারো জানা থাকে তাহলে সংশোধন করে দিলে ভালো হবে।

হিন্দু শাস্ত্রমতে সাধারণত ভাদ্র মাস, আশ্বিন মাস, কার্তিক মাস, পৌষ মাস ও চৈত্র মাসে ছেলে মেয়ের বিবাহ অনুষ্ঠান হয়না। তাই মায়ের আক্ষেপ খাঁদির বিয়ে যেভাবেই হোক ফাল্গুন মাসে দিতেই হবে। তাই ছড়া কাটেন-
“আগুন মাসে ঢ্যাং কুড়াকুড়
ফাগুন মাস গিয়া
চৈত মাসে পা দিলো
 খাঁদির হবেনা বিয়া”
আগেকার দিনে গৌরীদান প্রথা চালু ছিল। মেয়ের বয়স ছয় থেকে আট বছর হলে বিয়ে দেওয়া হত। এই নিয়ে ঠান দিদিদের ছড়া-
“আটে কন্যে নয়ে ধান
তবে পাত্র ডেকে আন”
মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর যখন শ্বশুর বাড়ি যায় তখন মা, বাবার হৃদয় কেঁদে ওঠে। কিন্তু সহজাত প্রবৃত্তি অনুযায়ী মেয়ের আসল বাড়ি হয়ে ওঠে স্বামী গৃহ। তাই মেয়ে বাপের বাড়ি এলে মা মেয়েকে কিছুতেই ছাড়তে চায়না। তখন মেয়ে ছড়া কেটে বলে-
“বারোমাসে তের পূজো
ভাদ্র মাসে তাল
পরের বাঁধা হয়েছি মাগো
রাখবে কত কাল
খ্যাপা লেলা মাগো তুমি
 কান্না কেন করো
ভেবে গুনে দেখ মা তুমি
কার ঘর কন্না করো”
মেয়ের দূরে বিয়ে দেওয়ার পর মাস পেড়িয়ে বছর ঘুরে আসে। মেয়েকে ডেকে আনতে লোক পাঠায় তবু মেয়ে সংসার ছেড়ে আসতে পারেনা। তখন সেই লোক কে দূত করে মেয়ে ছড়ার মাধ্যমে বার্তা পাঠায়-
“আম গাছটি জাম গাছটি
ঝড় পুতুলের বিয়ে
এত টাকা দিলে বাবা
কেন দূরে দিলে বিয়ে?
আগু কাঁদে মা বাবা
পিছু কাঁদে পর
পরে পদ্ম পাতায় লিখে মাগো
গিয়েছি শ্বশুর ঘর
শ্বশুরদের ঘর খানটি
বেতের বাঁধুনি
তাতে বসে পান সাজাবে
যশোদা রাণি
একটা বাটিতে ঘি চন্দন
আর একটি বাটিতে দুধ
 মা বাবাকে বোলো গিয়ে
বিটির বড় সুখ”।
কোনো এক মায়ের ছেলে বড় হয়েছে কিন্তু উপযুক্ত পাত্রীর অভাবে ছেলের বিয়ে দিতে পারছেনা, তাই মা হরির পূজা করছে যাতে মনের মতো পাত্রী জোটে। তাই ছড়া কেটে বলে-
“শতদল মল্লিকা ফুলে
 পূজবো হরি চরণ তলে”
তখন হরি স্বপ্নে বলেন কি গো মা তোমার কেমন মেয়ে চায়? উত্তরে মা জানান-
“মন ভরা ধন চায়
কোঠা ভরা বৌ চায়
আখার বাঞ্চা ঝি চায়
আলনায় কাপড় ঝলমল করে
ঘরে বাসন ঝন ঝন করে
পাট বস্ত্র পরিধান-
সিঁথির সিদুর মুখে পান।।”
আমরা পুরানের কাহিনী শ্রীকৃষ্ণের জন্ম বৃত্তান্ত সবই জানি। কৃষ্ণ বাসুদেব ও দেবকীর সন্তান হলেও কৃষ্ণ বড় হয়েছে মথুরার নন্দ ঘোষ ও যশোদার বাড়িতে। সেখানে কৃষ্ণ ছোটোবেলায় দূরন্তপানা করত তার ছবি এই ছড়ায় ধরা পড়েছে।
“ যশোদা রানি নন্দ ঘোষ বড় ভাগ্যবান
 তাদের ঘরে জন্ম নিল কৃষ্ণ বলরাম
কৃষ্ণ যাচ্ছে বাথান হতে জলে সাজা ঘটে
 তে কৃষ্ণ খালি ঘটে সকল ননী লোটে
ননী খেল কেরে কানাই? ননী খেল কে?
আমি তো মাগো খাইনি ননী বলাই খেয়েছে
বলাই যদি খেত ননী থুতো আধো আধো
 তুই তো কানাই খেয়েছিস ননী ভাঁড় করেছিস শোধ্য
নন্দরানীর হাতে লড়ী ধায় পিছে পিছে
এক লম্ফে লাফিয়ে ওঠে কদম্বেরি গাছে
 এ ডাল ও ডাল করে কানাই পাতায় দিলে পা
 তাহা দেখে নন্দরাণীর থরে কাঁপে গা
 ওরে ওরে বাপু আসছে পেড়ে দেব ফুল
ওখান থেকে পড়িস যদি মাজা যাবে চুড়”
এরপর মায়ের কথা শুনে কৃষ্ণ গাছ থেকে নেমে আসে আর সঙ্গে সঙ্গে মা কৃষ্ণকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে। তখন কৃষ্ণ বলে-
” আর বেঁধোনা বেঁধোনা
বন্ধনেতেই মরি
হাতের মূরলী বেচে
তোমায় এনে দেব কড়ি”
তারপর সত্যি সত্যি মা যশোদা হাতের বাঁধন খুলে দিয়েছিল কিনা বা কৃষ্ণ বাঁশি বিক্রি করে তার মাকে পয়সা দিয়েছিল কিনা সেকথা পুরানের পাতা ঘাটলেই পাওয়া যাবে।
এই ছড়াগুলি তখনকার দিনে মা ঠাকুরদার মুখে মুখে ঘুরে বেড়াত। কথায় কথায় ছড়া কেটে প্রশ্নের উত্তর দিত। ধীরে ধীরে এই সমস্ত লোকগাথা গুলি হারিয়ে যাচ্ছে আধুনিক জীবন থেকে। যদি এই গাথা গুলি লিপির আকারে ধরে রাখা না হয় তাহলে পরবর্তী প্রজন্মে এর কোনো অস্তিত্ব থাকবেনা।
প্রদীপ মন্ডল

কবি ও হেতমপুর রাজ স্কুলের বাংলা ভাষার শিক্ষক। সিউড়ি থেকে লিখছেন।

Post a Comment

0 Comments