১: বীরভূমের নামের কথা অনেকেই বলে থাকেন বীরপুত্রদের দেশ হিসাবে। প্রাচীন আদিবাসীগণ ছিলেন যুদ্ধকুশল। বিভিন্ন আক্রমণ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য তারা ক্রমশ যুদ্ধকুশল হয়ে উঠেছিলেন। এই সকল বীর যোদ্ধারা এখানে বাস করতেন বলে এই দেশকে বলা হত বীরদের ভূমি বা বীরভূমি।
‘দিগ্বিজয় প্রকাশ’ গ্রন্থে এই রাঢ় ভূমির যে সীমার বর্ণনা দিয়েছেন, তা ঠিক এইরূপ-
“গৌড়স্য পশ্চিমে ভাগে বীরদেশস্য পূর্ব্বতঃ।
দামোদরোত্তর ভাগে রাঢ়দেশঃ প্রকীর্ত্তিতঃ।।”
এখান থেকে বীরভূম বর্তমান নাম এসেছে বলে অনুমান করা হয়।।
একটি উপকথায় বীরভূমবাসীর বীর্য্যবত্তা পাওয়া যায়। যা হল- বিষ্ণুপুরের রাজা একবার নিজের রাজ্যের বাইরে শিকারের উদ্দেশ্যে এক পাথুরে সীমান্ত প্রদেশে এসে পৌঁছান। ইচ্ছা জাগে বক শিকার করার। সেই উদ্দেশ্যে তার নিজের একটি সুশিক্ষিত বাজপাখিকে একটি বককে লক্ষ্য করে উড়িয়ে দেন। কিন্তু দেখা যায় বকটি উলটে বাজপাখিটিকে এমন ভাবে তেড়ে আসে যে রাজা নিজেয় বিস্মিত হয়ে পড়েন। তখন তিনি ভাবেন যে দেশের পাখিই এত বীরত্ব দেখাতে পারে, সেই দেশের মানুষেরা কি ভয়ঙ্কর বীর হতে পারে। এই সব কথা ভেবে তিনি তখন এই স্থানটিকে বীরমাটি বা বীরভূমি নামে অভিহিত করেন।
২: অনেকে আবার বলে থাকেন এটি বীরাচারী তান্ত্রিকদের দেশ। সেই হিসাবে অনেকে বীরভূম বলে থাকেন।
৩: বীরভূমি এই নামে অনুরূপ আরও অনেকগুলি নাম লক্ষ্য করা যায়। যেমন – মল্লভূম, সিংভূম,ধলভূম, সেনভূম ইত্যাদি ইত্যাদি। এই রকম লক্ষ্য করে ‘মল্লভূমি’ প্রবন্ধের লেখক মনে করেছিলেন যে, মল্লগণের বিভিন্ন সম্প্রদায়, যেমন- মান, সিংহ, বরা, ধল ইত্যাদি বিভিন্ন সময়ে মল্লভূমি থেকে ইতস্ততঃ ছড়িয়ে পড়ে এবং সেই সকল থেকেই মানভূম, ধলভূম, সিংভূম ও বীরভূম ইত্যাদি এসেছে।
8: সুবর্ণগ্রাম ও লক্ষণাবতী গ্রামের দুই শাসনকর্তার মধ্যে ১৩৫০ খ্রীষ্টাব্দের আগে ও পরে পরস্পর দীর্ঘকাল কলহলিপ্ত ছিল। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ‘বীর’ উপাধীধারী এক হিন্দু তৎকালীন লখনুরে (বর্তমান রাজনগর) নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন। তার ওই বীর উপাধি থেকেই বীরভূমের নাম এসেছে বলে অনুমান করা হয়।
৫: বল্লালসেনের সীতাহাটি তাম্রশাসন থেকে জানা যায়- বীরসেন নামে কোনো চন্দ্রবংশীয় রাজা ছিলেন।তাঁরই বংশে জন্মগ্রহন করেছিলেন সামন্তসেন, বিজয়সেন, বল্লালসেন প্রমুখ সেনবংশীয় রাজাগন। অনেকের মতে এই সকল রাজারায় তাঁদের পূর্ব পুরুষ বীরসেনের নামানুসারে এই অঞ্চলের নাম রাখেন বীরভূমি।
৬: প্রবাদ এও আছে যে সাতশ-আটশ বছর আগে পশ্চিমোত্তর প্রদেশ থেকে বীরসিংহ ও চৈতন্য সিংহ নামে দুই ভাই বীরভূমে এসে এখানকার অসভ্য আদিবাসীদের পরাজিত করে বীরসিংহপুর নামে নিজের রাজধানী স্থাপন করেন এই বীরসিংহ। এই বীরসিংহ রাজাই বীরভূমের আদি হিন্দু-ক্ষত্রিয় রাজা ছিলেন।
এই সম্পর্কে অন্য একটি প্রবাদও আছে। বীরসিংহ জরাসন্ধ রাজার বা তাঁর পুরোহিতের বংশধর এবং বীরভূমের শেষ হিন্দু রাজা। ইনি মুসলিমদের হাতে যুদ্ধে নিহত হন। রাজমহিষী ও অত্যাচারের ভয়ে কালীদীঘীর জলে ডুবে আত্মহত্যা করেন।।
এই বীরসিংহ সম্বন্ধে এখনো একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে- তিনি এতটাই বলশালী ছিলেন যে হাতের মুঠোয় সর্ষে পিষে তেল বের করতেন।
এই বীরসিংহ রাজার নাম থেকেই বীরভূম নামের কথা অনেকেই বলে থাকেন।
৭: সাঁওতালী ভাষায় ‘বির’ শব্দের অর্থ হল জঙ্গল। এই জন্য অনেকে আবার মনে করেন জঙ্গলময় এই স্থানের নাম ঐ ‘বির’ শব্দ থেকে এসেছে। কিন্তু একথাও মনে রাখার যে বীরভূম নাম হওয়ার সময়কালে সাঁওতালদের প্রাচুর্য এদেশে ছিল না।।


0 Comments